Skip to main content

বৃষ্টি, আমার একান্ত আপন"

 📖 গল্পের নাম: "বৃষ্টি, আমার একান্ত আপন"



জানালার ধারে বসে তিথি।

তার সামনে ছড়িয়ে রয়েছে শহরের ধূসর দৃশ্যপট — গাছপালা, ট্রাফিকের শব্দ আর সেই চিরচেনা বৃষ্টির ধারা।

বৃষ্টি পড়ছে নিরবধি, যেন নিঃশব্দ কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছে তার মনের ভেতরের অশ্রুত কথার সাথে।


সে জানালার কাচে হাত রাখে। ঠান্ডা কাচের ওপাশে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে — একটার পর একটা।

তার চোখ বন্ধ, কানে হেডফোন — বাজছে তার প্রিয় গান। কিন্তু সুরের নিচে চাপা পড়ে আছে তার দীর্ঘশ্বাস।


একসময় এই বৃষ্টি ছিল তার প্রিয় সঙ্গী।

ছোটবেলায় বৃষ্টি মানেই ছিল আনন্দ, খেলা, ছুটে যাওয়া — নাচা ভেজা পায়ে স্কুলের গেট পর্যন্ত দৌড়ে যাওয়া।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আনন্দ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।


তিথি সবসময় চেয়েছিল বর্ষায় সমুদ্র দেখতে।

একদিন সে ভাবত, এক কাপ চা হাতে, সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখবে — সেই ছায়া-মাখানো প্রেমের মুহূর্ত।

তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।


সাধারণ চাকরি, ক্লান্ত দুপুর, ট্রাফিক জ্যাম আর একঘেয়ে জীবন তিথির স্বপ্নগুলোকে ধীরে ধীরে পিষে ফেলেছে।

দিন শেষে সে শুধু জানালার পাশে বসে গান শোনে, আর ভাবে,

“আমি আর কখনো কি ভিজবো? আমি আর কখনো কি কোথাও যাবো?”


মানসিক ক্লান্তি আর একাকীত্বে সে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল।

বন্ধু নেই, সঙ্গী নেই — শুধু পুরনো কিছু স্মৃতি আর নতুন কিছু না-পূরণ হওয়া ইচ্ছা।


আজকের বৃষ্টিটা যেন অন্যরকম।

সে অনেকদিন পর অনুভব করল ভেতরটা ভারী হয়ে আসছে।

হঠাৎ চোখে জল এল — নিজের অজান্তেই।


জানালার ওপাশে একটা ছোট্ট মেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে নাচছে।

চোখে ছিল আনন্দ, মুখে ছিল মুক্তি।

তিথির মনে হল, এই মেয়েটা যেন তার ছোটবেলার প্রতিচ্ছবি।

সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, হঠাৎ তার ভিতরে কিছু একটায় নড়েচড়ে উঠল।


তিথি ভাবল —

"আমি কি সব ভুলে গেছি? আমার ছোট্ট সেই মেয়েটা কি হারিয়ে গেছে?"


না, সে হারায়নি।

সে রয়ে গেছে ভেতরে, শুধু দরজা খুলে তাকে বের করতে হবে।


তিথি নিজের জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিল।

এই বর্ষায় না হোক, পরের বর্ষায় সে যাবে — কোথাও, যেখানেই হোক।

সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে গান গাইবে, ভিজবে, হাসবে।


সে আর একা থাকবে না,

আর কেবল অপেক্ষা করবে না।


তার জীবন আবার শুরু হবে — বৃষ্টির সাথে,

সেই ছোট মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে।




📝 লেখক: তিথি

ভ্রমণ, ভালোবাসা আর জীবনের গল্প

Comments

Popular posts from this blog

সাগরের মাঝে একলা আমি – নীল জলের অচেনা যাত্রা

 সাগরের মাঝে একলা আমি – নীল জলের অচেনা যাত্রা "সাগরের মাঝে একলা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, ঢেউয়ের শব্দ, নীল আকাশ আর একাকীত্বের শান্তি নিয়ে লেখা একটি ভ্রমণ গল্প।" ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো নিজের সাথে সময় কাটানো। অনেকেই বলে একা ভ্রমণ মানেই ভয়, কিন্তু আমার কাছে একা ভ্রমণ মানে মুক্তি। সেই মুক্তির খোঁজেই একদিন আমি নেমে পড়েছিলাম সাগরের পথে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ঘাট থেকে একটি ছোট নৌকায় উঠে যাত্রা শুরু করলাম গভীর নীল সাগরের দিকে। সেদিন আকাশে ছিল হালকা মেঘ, বাতাস ছিল বেশ জোরে। ঢেউগুলো নৌকাকে দোলাচ্ছিলো ঠিক দোলনার মতো। একা বসে আমি শুনছিলাম ঢেউয়ের শব্দ, যা যেন মনে হচ্ছিল আমার হৃদস্পন্দনের সাথে তাল মিলিয়ে বাজছে। চারপাশে শুধু জল আর জল। দূরে কোথাও একটা সাদা পাখি ভেসে চলেছে বাতাসে, যেন সেও একা আমার সঙ্গী। প্রথমে ভেবেছিলাম ভয় লাগবে, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ভয় নয় বরং এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো মনে। মনে হচ্ছিল, শহরের সমস্ত কোলাহল, মানুষের ভিড়, দায়িত্ব– সব ফেলে এসেছি অনেক দূরে। শুধু আমি আর এই বিশাল নীল সাগর। নৌকার মাঝি মাঝে মাঝে কিছু গল্প করছিলো। বললো, রাতে মাঝ সাগরে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখলে মনে হয় নক্ষত্রগুলো ...

🌧️ তাংগুয়ার হাওরের অপূর্ণ স্বপ্ন

 🌧️ তাংগুয়ার হাওরের অপূর্ণ স্বপ্ন "একজন মেয়ের স্বপ্ন ছিল তাংগুয়ার হাওরের বৃষ্টিভেজা সৌন্দর্য দেখা। কিন্তু জীবনের টানাপোড়েন আর আর্থিক কষ্টে তা পূরণ হয়নি। এই আবেগঘন ভ্রমণকাহিনিতে লুকিয়ে আছে অপূর্ণ স্বপ্ন, আশা আর জীবনের সত , স্বপ্নের এক বিশাল ক্যানভাস। বর্ষাকালে যখন চারপাশে নীল পাহাড়, দুলতে থাকা নৌকা আর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, তখন মনে হয় যেন পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত জায়গা এটা। তিথি ছোটবেলা থেকেই বইয়ে পড়েছে তাংগুয়ার হাওরের কথা। মনে মনে ভেবেছিল, একদিন নৌকায় বসে বর্ষার দিনে এই হাওরে ঘুরবে। জলের ভেতর সূর্যের আলো দেখবে, আকাশে ভাসমান মেঘের ছবি আঁকবে মনে। কিন্তু বাস্তবের জীবন তাকে অন্য পথে নিয়ে যায়। তিথির বিয়ে হয়েছিল কম বয়সে। সংসারটা খুব সহজ ছিল না। স্বামী মানসিকভাবে স্থির ছিলেন না, ছোটখাটো বিষয়েও রাগ হতো। তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হতো প্রতিদিন। আর্থিক দিক থেকেও সবসময় টানাপোড়েন চলত। চারপাশের মানুষ যখন ঘুরতে যেত, ছবি দিত সোশ্যাল মিডিয়ায়, তখন তিথির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠত। "আমি কি কোনোদিন পারব সেখানে যেতে?" কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর নীরব থেকেছে সবসময়। একদিন ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে তিথি দ...