রাস্তা হারিয়ে পেলাম নতুন গন্তব্য – অচেনা পথে অচেনা অভিজ্ঞত
"পাহাড়ি পথে ভ্রমণ করতে গিয়ে হারানো রাস্তা এবং সেই ভুল পথে পৌঁছানো অচেনা গ্রাম ও নতুন অভিজ্ঞতার গল্প।
ভ্রমণ মানে সবসময় পরিকল্পিত পথ না। কখনো কখনো সেই অপ্রত্যাশিত ভুল পথই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা এনে দেয়। এমনটাই হলো আমার এক পাহাড়ি যাত্রার গল্পে।
বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলে ট্রেক করতে গিয়েছিলাম একাই। মানচিত্রে সব ঠিকমত চিহ্নিত, কিন্তু বাস্তব পথ একেবারেই আলাদা। প্রথম কয়েক ঘণ্টা সুন্দরভাবে ট্রেক হলো, কিন্তু হঠাৎ রাস্তা মিলতে লাগলো না। যেখানে আমি যেতে চাইছিলাম, সেই গন্তব্যের কোনো চিহ্ন চোখে পড়লো না। প্রথমে মনে হলো ভয় লাগবে। পাহাড়, ঘন জঙ্গল, দূরে কুয়াশার মাঝে অচেনা ট্রেইল— সব মিলিয়ে মনে হলো আমি ভুল পথে চলে এসেছি।
কিছুক্ষণ থামলাম। নিজের দিকে তাকালাম। হ্যাঁ, আমি একা। কিন্তু ভয়কে জয় করতে হবে। ভাবলাম, ঠিক আছে, ভুল পথ হলেও এগোতেই হবে। প্রতি পদক্ষেপে ধুলো ও পাতা ভেজা, আর চারপাশে সবুজ পাহাড়ের নীরবতা। নাকি প্রকৃতিই আমাকে শান্তি দিতে চাইছে, বুঝলাম না।
হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম দূরে অচেনা গ্রাম। ভাবলাম, কেন না সেই দিকে যাই। পথের দুপাশে ছোট ছোট ঝর্ণা, জলধারা এবং বনজ প্রাণীর ডাক— সব মিলিয়ে যেন জঙ্গলের সঙ্গীত। পাহাড়ি বাতাস চোখ খুলতে সাহায্য করছে। পায়ে ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু মন আনন্দে ভরে যাচ্ছে।
গ্রামে পৌঁছতেই প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। গ্রাম ছোট, কয়েকটি বাঁশের ঘর পাশে পাশে সাজানো। মানুষজন এখনো বাইরে কাজ করছে। বাচ্চারা খেলা করছে, মহিলারা শাক-সবজি কাটছে, পুরুষরা গাছের কাঠ নিয়ে আসছে। তাদের চোখে কৌতূহল, মুখে হাসি। আমি হেসে হাত নেড়ে স্বাগত জানালাম।
এক বৃদ্ধ লোক আমাকে ডাকলেন। “দেখুন, অচেনা অতিথি এসেছে,” বললেন। আমি ব্যাগ রেখে তাদের কাছে গেলাম। তারা আমাকে বসতে দিল আগুনের পাশে। তারপর রান্না হলো সহজ ভাত, পাহাড়ি শাক আর মাছ। খেতে খেতে বুঝতে পারলাম, কখনো সাদাসিধে খাবারও এত আনন্দ দিতে পারে।
সন্ধ্যার দিকে গ্রামের তরুণরা নাচ-গান শুরু করল। ঢোলের তালে নাচ, আগুনের আলো, চারপাশে পাহাড়— মনে হলো যেন পুরোনো লোককাহিনির মধ্যে ঢুকে পড়েছি। শিশুরা আমার চারপাশে ঘুরছে, কখনো চুপচাপ, কখনো হেসে খেলে। আমি বসে শুধু দেখছি, শুনছি, অভিজ্ঞতা নিয়ে নিচ্ছি।
রাত নামতেই আমাকে ঘরে থাকার ব্যবস্থা করল। মাটির চাটাই, পাতলা কম্বল। জানালা খুলে ঘরে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করছে। বাইরে কুয়াশা, দূরে নদীর কলকল, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক— এই সমস্ত শব্দের মেলবন্ধন যেন এক নতুন সুর তৈরি করছে।
ভোরে ঘুম ভাঙলো পাখির ডাক আর শিশুর কণ্ঠে। দরজা খুলতেই দেখলাম কুয়াশায় ঢাকা পাহাড় আর সোনালি আলো। এক মহিলা গরম চা নিয়ে এল, পাশে সামান্য ভুট্টা। খাবার সরল, কিন্তু হৃদয় গরম করে।
গ্রাম ছাড়ার আগে সবাই হাত নেড়ে বিদায় জানাল। শিশুদের চোখে উচ্ছ্বাস, বৃদ্ধদের চোখে মমতা। আমি হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, ভুল পথই আমাকে নতুন অভিজ্ঞতা দিল। নতুন গ্রাম, নতুন মানুষ, নতুন শিক্ষা— সবকিছুই হাতের নাগালে।
যাত্রার শেষ মুহূর্তে বুঝলাম, ভ্রমণ মানে শুধু মানচিত্রের পথ অনুসরণ করা নয়। কখনো ভুল পথও জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা এনে দেয়। সেই দিন থেকে মনে মনে বারবার স্মরণ করি সেই পাহাড়ি গ্রাম, ভুল পথের গল্প আর মানুষের আতিথেয়তা।
Comments
Post a Comment