এক বৃদ্ধ দম্পতির করুণ অথচ অনুপ্রেরণামূলক গল্প—যেখানে দারিদ্র্য, ক্যান্সার, একাকীত্ব আর বেদনার মাঝেও স্বামী বেহালা বাজিয়ে স্ত্রীকে বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যায়।❤️❤️❤️❤️
ভালোবাসা কেবল সুখের দিনে হাত ধরে হাঁটার নাম নয়। প্রকৃত ভালোবাসা হলো, অন্ধকার রাতেও একে অপরের পাশে আলো হয়ে দাঁড়ানো। এই গল্প সেই আলো খুঁজে নেওয়া এক বৃদ্ধ দম্পতির—যাদের জীবন ভেঙে গেছে কিন্তু হৃদয় আজও অটুট❤️❤️❤️❤️❤️
ঢাকার ব্যস্ত শহরের এক কোণে, ভাঙাচোরা টিনের ঘরে বসবাস করেন বৃদ্ধ দম্পতি—আবদুল হক আর তার স্ত্রী রহিমা। বয়স তাদের অনেক হয়েছে, তবু চোখে মুখে এখনো জ্বলজ্বল করে জীবনের গল্প।
যৌবনে তারা অনেক ঘুরেছেন। কক্সবাজারের সাগর থেকে শুরু করে সিলেটের চা-বাগান—সব জায়গায় তাদের ভালোবাসার পদচিহ্ন আছে। হকের হাসি ছিলো উচ্ছ্বাসে ভরা, রহিমার কণ্ঠে ছিলো স্নিগ্ধতা। ছেলেমেয়েরা ছিলো, সংসার ছিলো, জীবনের রঙ ছিলো উজ্জ্বল।
কিন্তু সময় তো সব পাল্টে দেয়।
বছর কয়েক আগে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের একমাত্র ছেলে আর মেয়ে দুজনেই প্রাণ হারায়। সেই শোকের পর থেকে ঘরটা যেন শূন্যতায় ডুবে থাকে। সন্তানহীন জীবনে তারা পরস্পরের ওপরই ভরসা রেখেছেন।
এরপর হক তার চাকরি হারান। বয়স হয়ে গেছে, আর নতুন কোনো কাজ মিললো না। শরীর দুর্বল, হাড়ে ব্যথা, চোখে কম দেখে—সব মিলিয়ে কাজ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।
এমন সময় নতুন বিপর্যয় নেমে এলো। রহিমার শরীরে ধরা পড়লো ক্যান্সার। চিকিৎসকের কাছে যেতে গেলে বোঝা গেলো, তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রচুর টাকা। ওষুধ, কেমোথেরাপি, টেস্ট—সব মিলিয়ে এমন অঙ্ক, যা তাদের কল্পনারও বাইরে।
হকের চোখ ভিজে আসে প্রতিদিন। হাতে টাকা নেই, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে অনেক আগেই। সন্তান নেই যে পাশে এসে দাঁড়াবে। তবু হক হাল ছাড়েন না।
একদিন গভীর রাতে, স্ত্রীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি হঠাৎ মনে পড়লো তার কিশোর বয়সের কথা। সে সময় তিনি বেহালা আর গিটার বাজানো শিখেছিলেন। বন্ধুমহলে একসময় তার সুরেলা বেহালা বাজানোর সুনাম ছিলো।
কিন্তু সংসারের ব্যস্ততায় সেই বেহালা বহু বছর ধরে আলমারির এক কোণে ধুলায় ঢেকে পড়ে আছে।
হক বেহালাটা হাতে তুলে নিলেন। ধুলো মুছে তারে আঙুল বোলাতেই পুরনো সুর যেন আবার জীবিত হয়ে উঠলো। কাঁপা কাঁপা হাতে হলেও সুর বের হলো, আর সেই সুর যেন তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো তারুণ্যের দিনে।
সকালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাবেন। মানুষ যা দেবে, তা দিয়ে স্ত্রীর চিকিৎসা চালাবেন।
এভাবেই শুরু হলো হকের নতুন জীবনসংগ্রাম।
ঢাকার গুলিস্তান, ফার্মগেট কিংবা শাহবাগের রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিনি বেহালা বাজান। ভিড় জমে যায়। মানুষ প্রথমে অবাক হয়ে তাকায়, তারপর কেউ কেউ এগিয়ে এসে হাতে কিছু টাকা দেয়। কেউ দুঃখভরা চোখে বলেন,
—“চাচা, আপনার সুরে মন কাঁদছে।”
হক হাসেন। তিনি জানেন, প্রতিটি টাকার ভেতরে আছে তার স্ত্রীর জীবনের শ্বাস।
বাড়ি ফিরে রহিমাকে তিনি কিছু বলেন না। শুধু হাতে তুলে দেন ওষুধের প্যাকেট। রহিমা জানেন, এ বয়সে স্বামী তার জন্য কত কষ্ট করছে। চোখ ভিজে যায়, তবু তিনি বলেন—
—“তুমি থাকলেই আমি বেঁচে আছি।”
রাতে টিনের ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির শব্দ পড়ে, হক বেহালা হাতে বসে যান। রহিমা শুয়ে শুনেন। সেই সুরে মিশে থাকে দুজনের যৌবনের ভ্রমণ, হারানো সন্তানের স্মৃতি, আর ভালোবাসার শেষ লড়াই।
অভাব, দুঃখ আর রোগ—সব কিছুর মাঝেও তারা সুখ খুঁজে পান। কারণ তাদের বিশ্বাস—ভালোবাসা থাকলে জীবন কখনো একেবারে নিভে যায় না।
Comments
Post a Comment